কভিডের প্রভাবের অজুহাতে ক্ষতির শিকার দাবি করা পোশাক শিল্প মালিকরা আগামী দুই বছরের জন্য শ্রমিকদের মজুরি বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করতে চান না। গত রবিবার অনুরোধ জানিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধি সংক্রান্ত শ্রম আইনের বিধান থেকে দুই বছরের জন্য অব্যাহতি চেয়েছেন তারা।
পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বরাবর চিঠিটি পাঠিয়েছে বিকেএমইএ। চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও ইএবি বরাবর। বিকেএমইএর চিঠির বিষয়বস্তু যৌক্তিক বলে মনে করছেন বিজিএমইএর সাবেক ও বর্তমান প্রতিনিধিরা।
বিকেএমইএর সভাপতি সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান স্বাক্ষরিত চিঠির শেষাংশে বলা হয়, মজুরি বোর্ড ঘোষিত গেজেটে শ্রমিকদের বার্ষিক ৫ শতাংশ হারে মজুরি বৃদ্ধির একটি বিধান রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় যেখানে শ্রমিক-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন ভাতা নিয়মিত পরিশোধ করাটাই প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বেই বিভিন্ন খাতে যেখানে বেতন-ভাতা কমিয়ে দিয়েছে, সেখানে পোশাক খাতে ৫ শতাংশ বৃদ্ধি কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত নয় বলেই আমরা মনে করছি। আইনে থাকার কারণে কভিডের মধ্যে বিগত সময়েও আমরা ইনক্রিমেন্ট দিয়েছি। এ অবস্থায় ৫ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির এ বিধানটি আগামী দুই বছরের জন্য স্থগিত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
চিঠিতে পোশাক শিল্পে কভিড-১৯-এর প্রভাব সম্পর্কে বলা হয়, বিশ্ব মহামারী কভিড-১৯-এর ছোবলে সারা বিশ্বের অর্থনীতি পর্যুদস্থ, স্থবির হয়ে যাওয়া অর্থনীতির চাকাকে চলমান রাখার সংগ্রামে লিপ্ত উদ্যোক্তাসহ খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো। সংকুচিত হয়ে পড়েছে কর্মক্ষেত্র। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে লকডাউনে পড়ে গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে বিশাল এক জনগোষ্ঠী। পরিস্থিতি সামাল দিতে নেয়া হচ্ছে নানা পদক্ষেপ- কোথাও চলছে সাময়িক বন্ধ, চলছে কোথাও কর্মী ছাঁটাই, কোথাওবা চলছে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিভিন্ন পার্সেন্টেজে শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কমিয়ে দিয়ে টিকে থাকার প্রচেষ্টা। আবার ভারতের শিল্পঘন বেশকিছু রাজ্যে স্থগিত করে দেয়া হয়েছে শ্রম আইন।
কবে নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তার নেই কোনো পূর্বাভাস, চরম প্রতিকূলতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে এক অস্বাভাবিক সময়-এমন তথ্য উল্লেখ করে চিঠিতে আরো বলা হয়, এমনই পরিস্থিতিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের ঘোষিত সহযোগিতা নিয়ে কোনোভাবে টিকে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি খাত পোশাক শিল্প। পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ নেই, নেই আগামী দিনগুলোতেও স্বাভাবিক কার্যাদেশ প্রাপ্তির নিশ্চয়তা; যা কিছু কার্যাদেশ রয়েছে বা রফতানি হচ্ছে, তারও পয়সা মিলবে ১৬০ থেকে ২০০ দিন পর; আবার আগের তুলনায় পোশাকের মূল্য কমিয়ে দিয়েছে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। কোনো ধরনের দর কষাকষির সুযোগ নেই। শ্রমিক-কর্মচারীদের কর্মসংস্থান বজায় রাখার স্বার্থে জানা সত্ত্বেও লস দিয়েই কার্যাদেশ নিতে বাধ্য হচ্ছেন পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা। অন্যদিকে কাঁচামালের বাজারেও চলছে এক চরম অনিশ্চয়তা। সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবেলায় চরম হিমশিম খাচ্ছে দেশের রফতানির প্রধান এ খাতটি। এর পরও আমরা আশার আলো দেখছি এ কারণে যে প্রধানমন্ত্রী বা সরকার এ খাতটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সর্বদা পাশে থাকছেন।
মজুরি বৃদ্ধির বিধানে স্থগিতাদেশ নিয়ে বিকেএমইএর অনুরোধের বিষয়টি যৌক্তিক মনে করলেও তা প্রথম ধাপে দুই না বরং এক বছরের জন্য পেলে ভালো হয় বলে মনে করছেন বিজিএমইএ সংশ্লিষ্টরা। বার্ষিক মজুরি বৃদ্ধির বিধান থেকে অব্যাহতির অনুরোধটি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী বণিক বার্তাকে বলেন, বিকেএমইএর অনুরোধ যৌক্তিক বলেই আমি মনে করি। কভিডের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পোশাক শিল্প মালিকদের সময় খুব খারাপ যাচ্ছে— এটা এখন চরম বাস্তবতা।
সূত্র: বণিক বার্তা